যে পাঁচ কারণে জয়ের হাসি হাসলেন বাইডেন!

কয়েক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বৈশ্বিক মহামা’রি আর যু’ক্তরাষ্ট্রজুড়ে দীর্ঘ সামাজিক সহিং’সতার মতো অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মা’র্কিন নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে এমনই একজন জো বাইডেনের প্রতিপক্ষ ছিলেন, যিনি মা’র্কিন রাজনীতির প্রথাগত রীতির অনুসারী নন।

তবে জো বাইডেন প্রায় ৫০ বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁর দীর্ঘদিনের। অবশেষে তৃতীয়বারের চেষ্টায় সফল হলেন তিনি। তাঁর এমন জয়ের পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিবিসির দেওয়া এমন পাঁচটি কারণ-

কভিড, কভিড, কভিড

জো বাইডেনের জয়ের পেছনে সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ যা সব কিছুর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। করো’নাভাই’রাস যু’ক্তরাষ্ট্রে দুই লাখ তিরিশ হাজার মানুষের প্রা’ণ কেড়ে নিয়েছে। একই সঙ্গে বদলে দিয়েছে মা’র্কিন মানুষের জীবন ও রাজনীতি। উইসকনসিনে নির্বাচনী শোভাযাত্রায় কভিড-১৯ স’ম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রা’ম্প বলেছিলেন, ফেক নিউজে সব কিছুই কভিড, কভিড, কভিড, কভিড। মহামা’রি স’ম্পর্কে তাঁর যে অবস্থান, যেভাবে তিনি বিষয়টি সামলেছেন, সেটি শেষ পর্যন্ত তার বিপক্ষেই গেছে।

অ’পর দিকে জো বাইডেন ক্যাম্প কভিড ইস্যুতে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটি তাঁকে এগিয়ে দিচ্ছে- এমনটাই দেখা গিয়েছিল গত মাসে করা এক জনমত জ’রিপে। যাতে জো বাইডেন ১৭ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি ছিল ডোনাল্ড ট্রা’ম্পের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বৈশ্বিক মহামা’রিতে যে ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তা ডোনাল্ড ট্রা’ম্পের প্রচারণা কৌশলকে বাধাগ্রস্ত করেছে। মহামা’রি ও এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রা’ম্প প্রায়শই যেভাবে লক্ষ্যচ্যুত হয়েছেন, বিজ্ঞানকে প্রশ্ন করেছেন, একেবারে হুট করে এলোমেলো’ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, পক্ষপাতমূলক আচরণ- এ বিষয়গুলো জো বাইডেন ক্যাম্প সফলভাবে ডোনাল্ড ট্রা’ম্পের বিপক্ষে কাজে লাগিয়েছে।

হিসাব কষে ধীরগতির প্রচারণা

জো বাইডেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনীতিতে ভুল বক্তব্য ও অসমীচীন কাজের জন্য বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন। যেসব ভুল তাঁকে প্রায়শই বিপদগ্রস্ত করেছে। ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে এমন ভুল তাঁর হারের কারণ ছিল। ২০০৭ সালে আবার যখন তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন সেবার তাঁর তেমন একটা সম্ভাবনাই ছিল না। কিন্তু তৃতীয়বার যখন ওভাল অফিসের জন্য লড়েছেন, তখন তিনি বক্তব্য দেওয়ার সময় যথেষ্ট কম হোঁচট খেয়েছেন। এর একটি বড় কারণ হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রা’ম্প নিজে তাঁর লাগামহীন অসামঞ্জস্যপূর্ণ নানা বক্তব্যের কারণে নিয়মিত খবরের উৎস ছিলেন।

আর তা ছাড়া বৈশ্বিক মহামা’রি, অর্থনৈতিক সংকট, জর্জ ফ্লয়েড হ’ত্যার পর বর্ণবৈষম্যের বি’রুদ্ধে দীর্ঘ সময়ের সহিং’স বি’ক্ষোভ এ রকম জাতীয় পর্যায়ের বড় ঘটনার দিকে সমাজের মানুষের মনোযোগ বেশি ছিল। এর বাইরে এবার বাইডেন ক্যাম্প খুব হিসাব কষে এগিয়েছে। বাইডেনকে যতটা সম্ভব কম জনসম্মুখে আসতে দেখা গেছে। প্রচারণার গতি এমন ছিল, যাতে প্রার্থী ক্লান্তি থেকে অসাবধানতাবশত কিছু না করে বসেন। বাইডেন ক্যাম্প বরং ট্রা’ম্পকে তাঁর মুখ খোলার সুযোগ দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত কাজে লেগেছে।

আর যেই হোক ট্রা’ম্প নয়

নির্বাচনের দিনটির এক সপ্তাহ আগে জো বাইডেন ক্যাম্প তাদের সর্বশেষ টেলিভিশন বিজ্ঞাপন প্রচার করে। গত বছর জো বাইডেন প্রার্থী হিসেবে যখন মনোনীত হন এবং যেদিন তাঁর প্রচারণা শুরু করেন, সে সময়কার বক্তব্যের সাথে এই বিজ্ঞাপনের বক্তব্যে বেশ লক্ষণীয় সাদৃশ্য ছিল। এই নির্বাচনকে উল্লেখ করা হয়, ‘যু’ক্তরাষ্ট্রের আত্ম’রক্ষার যু’দ্ধ’। ডোনাল্ড ট্রা’ম্পের চার বছরকে বিভক্তি ও বিশৃঙ্খলার সময়কাল বলে উল্লেখ করা হয়।

ট্রা’ম্পের সময় যে মেরুকরণ হয়েছে, যে ধরনের বিতর্কের জন্ম তিনি দিয়েছেন, মা’র্কিন জনগণ তা থেকে মুক্তি চেয়েছে। তাঁরা শান্ত ও অবিচল একজন নেতা চেয়েছেন। ভোটারদের অনেকেই বলেছেন, তাঁরা ব্যক্তি হিসেবে ট্রা’ম্পের আচরণে রীতিমতো বীতশ্রদ্ধ। বাইডেন ক্যাম্প ডোনাল্ড ট্রা’ম্পকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে এই নির্বাচন যেন দুই প্রার্থীর মধ্যে যোগ্য একজনকে বেছে নেওয়ার নির্বাচন নয়।

এটি যেন ট্রা’ম্প স’ম্পর্কে একটি গণভোটের মতো বিষয়, এমন কৌশল ছিল বাইডেনের প্রচারণায়। জো বাইডেন ডোনাল্ড ট্রা’ম্প নন, এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে ভোটারদের।

মধ্যপন্থী অবস্থান

প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হওয়ার লড়াইয়ে জো বাইডেনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বার্নি স্যান্ডার্স, যিনি বামপন্থী হিসেবে পরিচিত। আর একজন ছিলেন এলিজাবেথ ওয়ারেন। যার ক্যাম্পেইনে বেশ ভালো অর্থের যোগান ছিল। এই দুজনের যেকোনো সভায় রক গানের কনসার্টের মতো মানুষ জড়ো হতো। কিন্তু জো বাইডেন উদারপন্থীদের চাপের মুখেও মধ্যপন্থী অবস্থান বজার রেখেছেন। তিনি সরকারি স্বাস্থ্য সেবাব্যবস্থা, বিনা মূল্যে কলেজশিক্ষা ও ধনীদের জন্য বেশি কর আরোপ করার নীতিগুলোতে সম’র্থন দেননি। এর ফলে তিনি মধ্যপন্থী ও অসন্তুষ্ট রিপাবলিকানদের কাছে টানতে পেরেছেন। কমলা হ্যারিসকে রানিং মেট হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে এটি প্রকাশ পেয়েছে।

বার্নি স্যান্ডার্স ও এলিজাবেথ ওয়ারেনের সঙ্গে শুধু একটি জায়গায় মতের মিল ছিল বাইডেনের। আর তা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা। এই ইস্যু দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করেছেন তিনি, যাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বেশি অর্থ, কম সমস্যা

এই বছরের শুরুতে জো বাইডেনের প্রচারণা তহবিল প্রায় শূন্য ছিল বলা যায়। ট্রা’ম্পের বিপক্ষে তাঁর সীমাবদ্ধতা ছিল এটি। ট্রা’ম্পের প্রচারণা ছিল শত কোটি ডলারের বিষয়। কিন্তু এপ্রিল মাসে এসে তহবিল গঠনে জো’রালো’ভাবে লেগে পড়ে বাইডেন ক্যাম্প। অন্যদিকে ট্রা’ম্পের পদ্ধতি হচ্ছে বাড়াবাড়ি অ’পচয়। নির্বাচনী প্রচারণার শেষের দিকে এসে ট্রা’ম্প ক্যাম্পের চেয়ে বড় তহবিল গড়েছিলেন বাইডেন।

অক্টোবর মাসে ট্রা’ম্পের চেয়ে ১৪৪ মিলিয়ন ডলার বেশি ছিল বাইডেনের তহবিলে। যা ব্যবহার করে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে রিপাবলিকানদের জর্জ’রিত করে ফেলা হয়। কিন্তু শুধু অর্থ দিয়েই সব হয় না। ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনও বড় তহবিল গড়েছিলেন। কিন্তু এবার করো’নাভাই’রাস মহামা’রির কারণে একেবারে মানুষের কাছে গিয়ে প্রচারণা অনেক কমিয়ে দিতে হয়েছে।

মানুষজন অনেক বেশি সময় ঘরে কাটিয়েছে, তাই গণমাধ্যমের প্রতি তাদের মনোযোগ অনেক বেশি ছিল। ভোটার আকর্ষণ করতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গণমাধ্যমে বার্তা দিয়ে গেছেন জো বাইডেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!