চিহ্নিন্ত হল যেটি করোনার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ – OnlineCityNews

চিহ্নিন্ত হল যেটি করোনার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ

মানুষ বনাম ভা’ইরাস ‘বিশ্বযুদ্ধ’ চলছে চার মাস ধরে। শত্রুপক্ষ খালি চোখে অদৃশ্য। ‘সার্স-কোভ-২’ (করো’নাভা’ইরাস) সংক্রমণে পৃথিবীজুড়ে এ পর্যন্ত দুই লাখেরও বেশি মানুষের মৃ’ত্যু হয়েছে। সংক্রমিত ৩০ লাখেরও বেশি। দিনরাত এক করে গবেষণাগারে প্রতিষেধকের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু তার জন্য আণুবীক্ষণিক শত্রুটিকে ভাল করে চেনা প্রয়োজন। সেই কাজটি করেছেন দুই বাঙালি বিজ্ঞানী। এখনও পর্যন্ত ভা’ইরাসটির ১১টি টাইপ বা ধরন সম্পর্কে জানা গেছে। তার মধ্যে সব চেয়ে ‘সংক্রামক’ ভা’ইরাস টাইপটিকে চিহ্নিত করলেন ভারতের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োমেডিক্যাল জিনোমিক্স’-এর দুই বিজ্ঞানী নিধানকুমার বিশ্বাস ও পার্থপ্রতিম মজুমদার। কেন সেটি এতটা সংক্রামক, তা-ও বিশ্লেষণ করেছেন তারা। ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল রিসার্চ’-এ সোমবার প্রকাশিত হয়েছে গবেষণাপত্রটি।

গত বছর ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহানে নোভেল করো’নাভা’ইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথম কারও মৃ’ত্যু হয়। এর পরে সীমান্ত পেরিয়ে উহান থেকে গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে কোভিড-১৯।  পার্থপ্রতিম জানান, পরীক্ষা করে দেখা গেছে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপকভাবে মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটেছে ভা’ইরাসটির গঠনে। প্রত্যেক ভা’ইরাসে ডিএনএ বা আরএনএ থাকে। ‘সার্স-কোভ-২’ আরএনএ ভা’ইরাস। এই জিনোমের গঠনে সামান্য অদলবদল ঘটে গিয়েই ভিন্ন চেহারা নেয় ভা’ইরাস। বাড়ায় সংক্রমণ ক্ষমতা। নিজেদের বাঁ’চার জন্যই তাদের এই লড়াই। ভা’ইরাস স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য তাদের বাসা বাঁধতে হয় কোনও প্রাণীর শরীরে। এক্ষেত্রে যা মানুষ (অর্থাৎ মানুষের শরীরের বাসা বেঁধে বাচার চেষ্টা করছে করো’নাভা’ইরাস)।

গোটা পৃথিবী থেকে পাওয়া ভা’ইরাসটির আরএনএ সিকোয়েন্সের তথ্য থেকে তাদের গতিবিধির উপরে নজর রাখছিলেন নিধান ও পার্থপ্রতিম। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৫৫টি দেশের ৩,৬৩৬ জন করো’না-রোগীর দেহ থেকে ভা’ইরাস-নমুনার আরএনএ সিকোয়েন্স নিয়ে গবেষণা করেন তারা।  পার্থ জানান, অন্যান্য ভা’ইরাসের মতো এটিও নিজের চেহারা বদলেছে। এখনও পর্যন্ত ‘ও’, ‘এ২’, ‘এ২এ’, ‘এথ্রি’, ‘বি’, ‘বি১’-সহ মোট ১১ ধরনের ভা’ইরাস মিলেছে। এর মধ্যে চিনে প্রথম সংক্রমণ ঘটায় ‘ও’। সেটি মূল। বাকি ১০টি তৈরি হয়েছে সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে। এর মধ্যে এখন সব চেয়ে সংক্রামক ‘এ২এ’। পার্থপ্রতিম বলেন, ‘‘অবাক করা বিষয়, বেশির ভাগ ভৌগোলিক এলাকাতেই দেখা যাচ্ছে দখল নিয়েছে নোভেল করো’নাভা’ইরাসের ‘এ২এ’। ‘এ২এ’-র অস্তিত্ব প্রথম ধ’রা পড়ে ২৪ জানুয়ারি। মার্চ মাসের শেষের মধ্যে মোটামুটি অন্য সবাইকে সরিয়ে দিয়ে ৬০ শতাংশ দেশে সংক্রমণ ছড়িয়েছে এরাই।’’  নিধান জানান, ইউরোপ-আমেরিকায় সব চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে ‘এ২এ’। আমা’দের দেশে সেখান থেকে ‘এ২এ’ এসেছে। আবার চীন থেকে এসেছে ‘ও’। ইরান থেকে এসেছে ‘এথ্রি’। তিনি বলেন, ‘‘এ২এ এবং ও, দু’টোই শক্তিশালী। তবে এ২এ বেশি শক্তি ধরে।’’

তার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন দুই বিজ্ঞানী। সার্স-কোভ-২ তার চরিত্র অনুযায়ী ফুসফুসে ঢুকে সংক্রমণ ছড়ায়। ভা’ইরাসটির স্পাইকে থাকা প্রোটিন মানুষের ফুসফুসে থাকা ‘এসিই২’ প্রোটিনটিকে কাজে লাগিয়ে কোষের উপরিভাগে ‘অ্যাঙ্কর’ করে বা জুড়েযায়। এর পরে ফুসফুসে উপস্থিত অন্য একটি প্রোটিন তাকে কোষের ভিতরে প্রবেশ করাতে সাহায্য করে। ‘এ২এ’-র ক্ষেত্রে তার স্পাইকে থাকা অ্যামিনো অ্যাসিডটি ‘অ্যাসপারটিক অ্যাসিড’ থেকে বদলে ‘গ্লাইসিন’-এ পরিণত হয়। যা তার সংক্রমণ ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দুই বিজ্ঞানী জানান, যেহেতু ভা’ইরাসটির মধ্যে এত পরিবর্তন ঘটছে, তাই ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক তৈরি বেশ চ্যালেঞ্জিং। ভা’ইরাসটি সম্পর্কে পুরোপুরি জানতে না-পারলে প্রতিষেধক তৈরি হলেও তা সবার শরীরে কাজ করবে না। সেই কাজেই সাহায্য করবে নিধান ও পার্থপ্রতিমের গবেষণা, আশাবাদী দুই বাঙালি গবেষক। সূত্র: আনন্দবাজার

Leave a Reply

Your email address will not be published.