Breaking News
Home / সারা দেশ / বিশ্ব চষে বেড়ানো পাঠাও এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফহিমের জীবনের গল্প

বিশ্ব চষে বেড়ানো পাঠাও এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফহিমের জীবনের গল্প

Advertisement

সৌদি আরবে বাংলাদেশি বাবা-মায়ের সংসারে জন্ম নেয় তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম সালেহ। জন্মের পর পরিবারের সঙ্গে যু’ক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে চলে যান তিনি। সেখানেই তার বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা। পড়াশোনা শেষে ফাহিম সালেহ নিউইয়র্কেই বসবাস করতেন।

Advertisement

মাত্র ৩৩ বছর বছরের ছোট জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল তরুণ এই উদ্যোক্তার। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পাঠাও-এর এই সহ-প্রতিষ্ঠাতার খণ্ড-বিখণ্ড ম’রদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে পেশাদার খু’নীর দল তাকে খু’ন করেছে।

বিল গেটস কিংবা মার্ক জাকারবার্গ হতে পারতেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত তরুণ এই উদ্যোক্তা। কিন্ত তিনি হয়ে গেলেন লা’শ, শরীরের ছি’ন্নভিন্ন টু’করোগুলো নিয়ে তার প্রা’ণ’হীন দেহ’টা পড়ে রইলো নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। ফাহিমের মৃ’ত্যুর খবরটা আসার আগে দেশের খুব বেশি মানুষ তার নাম জানতেন না।

কারণ আড়ালে থেকেই কাজ করতে পছন্দ করতেন তিনি। পাঠাওয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি, পরে নিজের অংশের শেয়ার বিক্রি করে পৃষ্ঠপোষক পদে ছিলেন। জোবাইক, যাত্রী-সহ আরও কিছু দারুণ প্রোজেক্টে তিনি ছিলেন বিনিয়োগকারী। এর বাইরে নাইজেরিয়াতে গোকাডা এবং কলাম্বিয়াতে পিকঅ্যাপ নামে আরও দুটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানি শুরু করেছিলেন, ভালো মুনাফাও অর্জন করেছিলেন সেখান থেকে।

ফাহিমের বাবা এবং মা দুজনেই ছিলেন বাংলাদেশী। তার জন্ম ১৯৮৬ সালে। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের হরিশপুর গ্রামের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সালাহউদ্দিন আহমেদ বিশ্বখ্যাত আইবিএম কর্পোরেশনের এডভাইজার হিসেবে আমেরিকায় চাকরি করতেন। আইবিএম থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন নিউইয়র্ক থেকে দেড়শ’ কিলোমিটার উত্তরের ডাচেস কাউন্টির ফুকেটসি এলাকায়।

স্ত্রী রায়হানা, দুই কন্যা এ্যাঞ্জে’লা ও রুবি এবং একমাত্র পুত্র ফাহিম সালেহকে নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদের চমৎকার সুখী সংসার। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি।  ফাহিমের জন্মের পরে সৌদি আবর থেকে তাদের পরিবার আমেরিকা চলে গিয়েছিল, ফাহিমের শৈশব-কৈশোরের সবটাই তাই আমেরিকাতেই কে’টেছে।

স্কুল এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের লেখাপড়া অত্যন্ত সফলতার সাথে শেষ করে তিনি বেন্টলি ইউনিভার্সিটিতে ইনফরমেশন সিস্টেমে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৯ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর থেকে চাকরি খুঁজছিলেন। নিউইয়র্কের পাশাপাশি তিনি বোস্টনের বিভিন্ন কোম্পানিতেও চাকরির আবেদন করেন। ওই সময় তিনি চাকরিও পেয়ে যান।

কিন্তু জন্ম থেকে নিউইয়র্কের সাথে অন্যরকমের এক মায়ায় জড়িয়ে যাওয়া ফাহিম বিশ্বের নিউইয়র্ক শহর ছাড়তে চাননি। তাই বোস্টনের খ্যাতনামা একটি কোম্পানির অ্যাপয়নমেন্ট লেটার হাতে পাওয়ার পর যোগদান করার জন্য দুই সপ্তাহ সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। ওই দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি তৈরি করেন প্রাংক ডায়াল ডট কম নামের একটি ওয়েবসাইট। যে ওয়েবসাইটটি খুবই অল্প দিনের মধ্যেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে।

দুনিয়ার নানা দেশের হাজারো মানুষ প্রাংক কল কেনার জন্য শত শত ডলার খরচ করতে থাকেন। এই সময় বেশ কিছু ওয়েব এডও তৈরি করেছিলেন তিনি। ইনফরমেশন টেকনোলজিতে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়া ফাহিম সালেহর সঙ্গে নাইজেরিয়ার এক তরুণও লেখাপড়া করতেন। দুজনে মিলে ২০টি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। কিশোরদের জন্য তৈরি করা এসব ওয়েব থেকে বছরে অন্তত তিন লাখ ডলার আয় হতো তাদের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানির।

প্রাংক ডায়ালের মতো ওয়েবডেভলপ করে এই কোম্পানির আয় রাতারাতি বেড়ে যায়। দুহাতে প্রচুর ডলার আসতে থাকে ফাহিমের। তিনি চাকরিতে যোগ না দিয়ে পুরোপুরি ওয়েব ডেভলপার হিসেবে কাজ করতে থাকেন। কোম্পানির সমৃদ্ধিতে আত্ননিয়োগ করেন ফাহিম। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন ফাহিম। ওই সময়ে যুক্ত হন রাইড শেয়ারিং কোম্পানি পাঠাওয়ের সঙ্গে।

২০১৫ সালে যখন বাইক রাইড শেয়ারিং নিয়ে কারো তেমন কোন ধারণাই ছিল না, তখন মাত্র ১০০টি বাইক নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল পাঠাও। সেই পাঠাও এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাইড শেয়ারিং কোম্পানী, প্রায় ১ লক্ষ রাইডার কাজ করেন পাঠাওয়ে, প্রায় চার হাজার কোটি টাকা এই কোম্পানি মূল্যমান, কয়েক’শ কোটি ইনভেস্টমেন্ট। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, পাঠাওয়ের আগমনের কারণে অজস্র মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হয়েছে।

বেকার যুবকরা রাউড শেয়ারিংয়ে নাম লিখিয়েছে, মোটর সাইকেলের বিক্রি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশে পাঠাও প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ফাহিম সালেহর সাথে আরো দুজন ছিলেন। যাদের কাছে পরবর্তী সময়ে ফাহিম সালেহ তার কিছু শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে নিউইয়র্কে ফিরে যান। তবে থেমে থাকেননি তিনি। এরপর ‘পাঠাও’-এর আদলে অন্য দেশে ব্যবসা প্রসারের চিন্তাভাবনা শুরু করেন ৩৩ বছর বয়সী এ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ছাড়াও, নেপাল, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া ও আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় আরও দুটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি। নাইজেরিয়ায় চালু করা ওকাডা ওই দেশের বর্তমান সময়কালের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং এ্যাপ। অত্যন্ত মেধাবী ফাহিম সালেহর স্বপ্ন ছিল রাইড শেয়ারিং অ্যাপসকে ভিন্নমাত্রার উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।

তার আশা ছিল ইন্দোনেশিয়ার ওজেকের মতো পাঠাও’ও একদিন দারুণ এক সুপার অ্যাপে পরিণত হবে। শুধু রাইড শেয়ারিংই নয়, পেমেন্ট এবং ই-কর্মাসও করা যাবে এই অ্যাপসের মাধ্যমে। এজন্য নানাভাবে কাজ করছিলেন তিনি। অ্যাপসের মানোন্নয়নে রাতে দিনে পরিশ্রম করছিলেন। নিউইয়র্ক শহরকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন ফাহিম সালেহ।

বিবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে ঢাকায় পাঠাও রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের কর্মক’র্তা ওসমানে বরাত দিয়ে জানায়, বাংলাদেশে অ্যাপ-ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং পাঠাও প্রতিষ্ঠার পরে থেকে ফাহিম সালেহ চেয়েছিলেন আফ্রিকা মহাদেশে ব্যবসা বিস্তার করতে। এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে নাইজেরিয়াতে ‘গোকাডা’ নামে একটি রাইড শেয়ারিং সার্ভিস চালু করেন। তার সাথে সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আরো একজন ছিলেন।

ফাহিম সালেহর মালিকানাধীন ‘গোকাডা’ সার্ভিস ডেলিভা’রিতে এক হাজার মোটরসাইকেল রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই সংকটে পড়ে তারা। কারণ নাইজেরিয়ার সরকার মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং নিষিদ্ধ করে। টেককাবাল নামে নাইজেরিয়ার একটি প্রযুক্তি বিষয়ক গণমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে বলছে, সংকটে পড়ার আগে এক বছরেই ‘গোকাডা’ ৫৩ লাখ ডলার আয় করে। যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ হয়ে গেলে ‘গোকাডা’ পার্সেল ডেলিভা’রি সার্ভিস চালু করে। বর্তমানে নাইজেরিয়ার রাজধানী লেগোসে তাদের ১০০০ মোটরসাইকেল রয়েছে।

পিতা-মাতা নিউইয়র্ক থেকে দেড়শ’ মাইল দূরে থাকেন। অথচ ফাহিমকে প্রতিদিনই ছুটতে হয় নিউইয়র্কে। তাই ছোটাছুটি না করে মন দিয়ে কাজ করে অ্যাপসের উন্নতি ঘটানোর জন্য তিনি বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় বিশ কোটি টাকা (২২ লাখ ডলার) দিয়ে কিনেন একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। নিউইয়র্কের অন্যতম অভিজাত এলাকা ম্যানহাটনে নিজের রোজগারের টাকা দিয়েই ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন তিনি। ওই ফ্ল্যাটে একা বসবাস করে অ্যাপস নিয়ে নানাভাবে গবেষণা করতেন তিনি। ঘাতকের দল সেই ফ্ল্যাটেই সম্ভাবনার এই বরপুত্রকে নির্মমভাবে খুন করে।

ফাহিম সালেহের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, ফাহিম সালেহ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র এবং সজ্জন। ২০১৪ সালে তিনি দেশে এসেছিলেন। ওই সময়ে যুক্ত হন রাইড শেয়ারিং কোম্পানি পাঠাওয়ের সঙ্গে। পাঠাওর বিকাশে নানাভাবে কাজ করেন। প্রথমদিকে পাঠাও দিয়ে ডিজিটাল ডেলিভা’রির কথা থাকলেও পরবর্তীতে পাঠাওকে রাইড শেয়ারিং কোম্পানি হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় করে তোলেন।

Advertisement
Advertisement

Check Also

গোসল করতে গিয়ে মিললো ক’ঙ্কাল, বাবা বললেন- ‘এইতো আমার মেয়ে’

Advertisement তিন মাস আগে নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নি’খোঁজ হন কলেজছাত্রী মিম খাতুন (১৮)। শনিবার সন্ধ্যায় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!