যে কৌশলে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ – OnlineCityNews

যে কৌশলে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ

ক’রো’না জেঁ’কে বসায় গত ২৬ মার্চ থেকে চলছে সাধা’রণ ছুটি। বন্ধ র’য়েছে গণপরি’বহন। ঈদ সামনে রেখে রা’জধানী ঢাকা’য় ঢুকতে ও বের হতে কড়াকড়ি আরোপের কথা বলেছে আইন-শৃ’ঙ্খলা রক্ষা’কারী বাহিনী। কিন্তু নানা ফ’ন্দিতে ঢাকা ছাড়ছে ‘কৌশ’লী’ মানুষ। বেশি টাকা খরচ হলেও ভে’ঙে ভে’ঙে রি’কশা, অ’টোরিকশা, মহেন্দ্র, ট্রাক, পিক’আপ ভ্যান’সহ নানা যানবাহ’নে মানুষ ছুটছে। তবে যাদের সা’মর্থ্য আছে, তাদের অনেকে ‘অ’সুস্থতা’র ছুতায় অ্যাম্বু’ল্যান্স ভাড়া করে ঢা’কা ছাড়ছে।

ঝালকাঠির রাজা’পুরের নারি’কে’লবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. মাসুম বি’ল্লাহ পলাশ। বেসরকারি একটি প্র’তিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে ঢাকার মিরপুর এলা’কায় বাস করেন। গত শুক্র’বার ঢাকা থেকে রা’জাপুরে নিজ বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ঢাকা থেকে রা’জাপুরের বাড়িতে আসতে ১৪ বার যানবাহন পাল্টে’ছেন তিনি। এ যাত্রায় তাঁর খরচ হয়েছে এক হা’জার ৮২০ টাকা। সময় লেগেছে প্রায় ১৬ ঘণ্টা।

বাড়ি ফেরার অভিজ্ঞ’তা বর্ণনা করে তিনি জানান, ভোর ৫টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে রিকশায় মিরপুর-১০ নম্বর বাসস্ট্যা’ন্ডে আসেন ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে। সেখান থেকে মিরপুর-১ নম্বর হয়ে সিএনজি অটো’রিকশায় গাবতলী আসেন ১৮০ টাকায়। গাবতলী থেকে ৪০০ টাকা ভাড়ায় একটি মাইক্রোবাসে ওঠেন পাটুরিয়া ফেরিঘাটের উদ্দেশে। ফেরিতে কোনো টাকা দিতে হয়নি। পদ্মা পাড়ি দিয়ে দৌলতদিয়া এসে ১৮০ টাকায় ফরিদ’পুর সদরে আসেন ব্যাটা’রিচালিত অটো’রিকশায়। ফরিদপুর থেকে মহেন্দ্রতে ১৫০ টাকা’য় আসেন ভাঙ্গা পর্যন্ত। সেখান থেকে অটোরিকশায় ১৫০ টাকায় আসেন বরিশালের বুরঘা’টা পর্যন্ত।

বুরঘাটা থেকে ভ্যানগাড়িতে ৮০ টাকা দিয়ে অচেনা একটি স্থানে আসেন। সেখান থেকে ১০০ টাকা খরচায় আরেকটি ভ্যানগাড়িতে আসেন ব’রিশালের রহমতপুর বিমানবন্দর পর্যন্ত। রহমতপুর বিমানবন্দর থেকে ৭০ টাকায় বরি’শালের নথু’ল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডে আসেন ভ্যানে। সেখান থেকে অটো’রিকশায় রূপাতলী বাস’স্ট্যান্ডে আসেন ৩০ টাকায়। রূপাতলী থেকে কালি’জিরা সেতু পর্যন্ত ৩০ টাকায় আসেন আরেকটি অটো’রিকশায়।

সেখান থেকে ১৫০ টাকা দিয়ে ঝাল’কাঠিতে আসেন একটি প্রাইভেট কারে। ঝাল’কাঠি থেকে ১০০ টাকায় অটোরি’কশায় আসেন রাজাপুরে। রাজাপুর থেকে নিজ বাড়ি নারিকে’লবাড়িয়ায় যান অটোরিকশায় ১৫০ টাকার বিনিময়ে। সব মিলিয়ে তাঁর মোট খরচ হয় এক হাজার ৮২০ টাকা।

তিনি আরো বলেন, গত বু’ধবার অফিস থেকে বাসায় আসার পথে বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে। ফলে পরদিন শ’রীরে জ্ব’র আসে। জ্বর হওয়ায় কম্পা’নি ছুটি মঞ্জু’র করে। ঢাকা’য় চিকিৎসা পাব কি না, সে চিন্তা করেই বাড়ির উ’দ্দেশে রও’না হই। দেশে যখন স্বাভাবিক অবস্থা ছিল, তখন ঢাকা থেকে সরাসরি ৪৫০-৫০০ টাকা’য় রাজাপুর আসা যেত। সময় লাগত ছয় থেকে সা’ত ঘণ্টা। সেখানে বর্তমানে প্রায় চার গুণ ভা’ড়া গু’নতে হচ্ছে। পাশা’পাশি সময় লাগছে তিন গুণ।

লক’ডাউন উপে’ক্ষা করে ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পণ্যবা’হী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে ঢাকা থেকে কৌ’শলে ঠাকুরগাঁ’ওয়ে ঢুকছে মানুষ। তবে মানুষজন দেখতে পেলে অনেক সময় ফিরিয়েও দিচ্ছে। গতকাল রবিবার দুপুরে সদর উপজে’লার জগন্না’থপুর ইউনিয়’নের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি কার্যা’লয়সংলগ্ন ঢাকা-ঠাকুরগাঁও মহা’সড়কে পণ্যবা’হী ট্রাকে ৩০ যাত্রী শহরে ঢোকার চেষ্টা করে। এ সময় স্থানীয় যুবকরা পিছু নিয়ে ট্রাকটি জ’ব্দ করে। পরে ট্রাকের পেছনে ত্রিপলের ভেতর ও ট্রাকচা’লকের স্থান থেকে বেরিয়ে আসে ৩০ যাত্রী। যাত্রীরা সবাই ঢাকা থেকে’ ঠাকুরগাঁওয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।

স্থানীয় এক যুবক মো’হাম্মদ জসি’ম জানান, ঠাকুরগাঁ’ওয়ের প্রবেশ’দ্বার ২৯ মাইল নামক স্থান পার হয়ে বড়খো’চাবাড়ী বাজারের আগে ওই ট্রাক থেকে দুজন’কে নামতে দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। পরে ট্রা’কটি ধাওয়া করে ৩০ যাত্রী পাওয়া যায়। জন’রোষে পড়ার আগেই যাত্রীসহ ট্রাকটি তাত্ক্ষ’ণিক ফেরত চলে যায়।

যাত্রীদের একজন ঠাকুরগাঁও হরিপুর উপ’জে’লার বাসিন্দা সাজেদুল ইস’লাম বলেন, ট্রাকের সব যাত্রীই ঢাকায় গার্মেন্ট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। সামনে ঈদ ও দীর্ঘ ছুটির কা’রণে সবাই ঠাকুরগাঁ’ওয়ে যাচ্ছিল। এ জন্য ট্রা’কের চালক জনপ্রতি এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টা’কা করে নিয়েছেন।

সদর থা’নার ওসি তান’ভিরুল ইস’লাম জানান, শহরের প্রবেশ’দ্বার ২৯ মাইল এলাকায় চেকপো’স্ট বসানোর পরও অনেক সময় কৌশলে কোনো কোনো ‘ট্রাক ও অ্যাম্বুল্যান্সে করে যাত্রী আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। গত কয়েক দিনে এমন বেশ কয়ে’কটি ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকার গুলশানের দোকান কর্মচারী শহিদুর ইস’লাম। করো’না সংকটে দোকানটি বন্ধ। অর্ধেক বেতন দিয়ে মালিক বলেছেন দোকান খুললে যোগাযোগ করতে। বাধ্য হচ্ছেন গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ী ফিরে যেতে। গতকাল রবিবার ভোর ৫টার দিকে ঢাকার গাবতলী থেকে রওনা দিয়েছেন। সকাল ১১টা নাগাদ তিনি পৌঁছাতে পেরেছেন মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত।

ততক্ষণে তাঁর ভাড়া বাবদ খরচ হয়ে গেছে প্রায় ৫৪০ টাকা। অথচ বাড়ির পথ বাকি রয়েছে আরো অনেকটা। গতকাল রবিবার শহিদুল ইস’লামের সঙ্গে কথা হয় পাটুরিয়া ৪ নম্বর ফেরিঘাটে। তিনি জানান, ঢাকার গাবতলী থেকে পাটুরিয়া ঘাটের দূরত্ব কমবেশি ৬০ কি’লোমিটার। স্বাভাবিক সময় এ রাস্তা’টুকু পার হতে সময় লাগে বড়’জোর আড়াই ঘণ্টা। পরি’বহন ভেদে ভাড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। অথচ রাস্তায় কোনো যান’জট না থাকলেও তাঁর সময় লেগেছে প্রায় ছয় ঘণ্টা। আর খরচা হয়ে’ছে ৫০০ টাকার ওপর।

গত শনিবার ভোর ৫টায় রাজধানীর মিরপুর থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন মো. খোকন, নূপুর আক্তার আর তাঁদের শিশুসন্তান সায়মুন। কখনো ব্যাটারিচালিত রিকশায়, কখনো অটোরিকশায় আবার কখনো হেঁটে বিকেল নাগাদ ফেরেন গ্রামের বাড়ি। তবে গ্রামে বাইরে থেকে মানুষ এসেছে, এমন সংবাদ পৌঁছে যায় স্বাস্থ্য বিভাগে। তাই করো’না পরিস্থিতিতে তাঁদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে সেখানে যান স্বাস্থ্যকর্মীরা।

মো. খোকন জানান, রাজ’ধানীর মির’পুরের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে চাকরি ছিল তাঁর। কিন্তু করো’না পরিস্থি’তিতে সরকা’রি বিধি-নিষেধের কারণে বন্ধ হয়ে যায় তাঁর প্রতিষ্ঠান। তাই বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী নূপুর আক্তার জানান, স্বামীর আয়ের পথ বন্ধ হওয়ায় অনেক কষ্টে’ই তাঁদের জীবন কা’টছিল। তাই বাড়িতে ফিরে আসেন।

শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথে ঘরমুখী যাত্রীদের ভিড় বাড়ছেই। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ঢাকা থেকে বিভিন্ন পরি’বহনে শিমুলি’ ঘাটে এসে ফে’রিতে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে তারা। তবে গ’তকাল রবিবার শিমু’লিয়া ঘাটে যেতে যাত্রীদের অনেক দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকটি চেকপোস্টে যাত্রীদের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেক যানবাহনকে ফি’রিয়েও দিয়েছে পু’লিশ। তার পরও গা’দাগাদি নি’য়ন্ত্রণ করা স’ম্ভব হয়নি।

(প্রতিবেদন তৈরি’তে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঠাকুরগাঁও, চাঁদপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও ঝালকাঠির রাজা’পুর প্র’তিনিধি)­

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *